More

    পেট্রোবাংলা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: ১৫ প্রার্থী বাদ পড়লেন, কারণ অজানা

    পেট্রোবাংলা এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন কোম্পানিগুলোতে সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখা ১৫ জন উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রার্থীর জন্য সমন্বিত নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন এক নির্মম প্রহসনে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চূড়ান্ত তালিকার দ্বারপ্রান্তে এসেও তাঁরা আকস্মিকভাবে বাদ পড়েছেন। এই আকস্মিক বাদ পড়ার ঘটনা কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রার্থীদের অভিযোগ, সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও অস্পষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে তাঁদের ছাঁটাই করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং হতাশাজনক। এই বিষয়ে পেট্রোবাংলা এবং তাদের অধীনস্থ কোম্পানিগুলো পরস্পরের প্রতি দায় চাপাচ্ছে, যার ফলে পরিস্থিতি আরও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে এবং বঞ্চিত প্রার্থীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

    চূড়ান্ত মুহূর্তে বাদ পড়ার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা

    ভুক্তভোগী প্রার্থীরা ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, পুলিশ ভেরিফিকেশন, এবং এমনকি মেডিকেল পরীক্ষাসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই তাঁরা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত কোম্পানিগুলোতে গিয়ে মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন করতে তাঁদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ, নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এক প্রার্থী প্রথম আলোর কাছে তাঁর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “সব পরীক্ষায় সফল হয়ে, হাজার হাজার টাকা খরচ করে মেডিকেল রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরও যখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার না দিয়ে আমাদের বাদ দেওয়া হলো, তখন মনে হয়েছে আমাদের সঙ্গে নির্মম প্রহসন করা হয়েছে।”

    প্রার্থীরা আরও দাবি করেন, বাদ পড়া এই ১৫ জনের কারোরই কোনো ফৌজদারি রেকর্ড নেই, কেউ কোনো মামলার আসামি নন, কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগও নেই। তবে, তাঁরা ইঙ্গিত করেছেন যে, “জুলাইয়ের গণ আন্দোলনে অনেকেই সরাসরি যুক্ত ছিলেন।” এই তথ্যটি তাঁদের বাদ পড়ার পেছনে একটি অঘোষিত কারণ থাকতে পারে বলে তাঁরা সন্দেহ করছেন, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন সৃষ্টি করছে।

    আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়

    নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে বাদ পড়া এসব প্রার্থীর জীবনে নেমে এসেছে তীব্র আর্থিক ও মানসিক সংকট। তাঁদের মধ্যে একজন আক্ষেপ করে বলেন, “এই চাকরির আশায় আমি আমার আগের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। এখন সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সও শেষ হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে আমি এখন মহাবিপদে। মা-বাবা অসুস্থ, তাঁদের ওষুধ কেনার মতো টাকাও আমার হাতে নেই।” এই ঘটনা কেবল একটি চাকরি হারানোর বিষয় নয়, এটি বহু স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়ার এক হৃদয়বিদারক চিত্র। এর ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং ভবিষ্যতের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা কাটিয়ে ওঠা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

    দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা: কে নেবে দায়?

    বাদ পড়া প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে, পেট্রোবাংলা এবং এর অধীনস্থ কোম্পানিগুলো পরস্পরের প্রতি দায় ঠেলে দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দিন আহম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, “পেট্রোবাংলা থেকে আমাদের কাছে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, আমরা সেই অনুযায়ী নিয়োগপত্র দিয়েছি। আমরা কাউকে বাদ দিইনি।” এই বক্তব্য কার্যত দায়ভার পেট্রোবাংলার ওপর চাপিয়ে দেয়।

    অন্যদিকে, পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) এস এম মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, “প্রার্থীরা কেন বাদ পড়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোই ভালো বলতে পারবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে কেউ উত্তীর্ণ হতে না পারলেই কেবল বাদ পড়ে। তবে, চূড়ান্ত নিয়োগ না হলে তার কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না।” এই বক্তব্য সরাসরি কারণ ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং দায়ভার পুনরায় অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর দিকে ঠেলে দেয়, যা দায়িত্বশীলতার অভাব এবং স্বচ্ছতার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।

    প্রার্থীদের দাবি ও ভবিষ্যত

    এই ঘটনা পেট্রোবাংলা এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলির নিয়োগ প্রক্রিয়ার সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাদ পড়া প্রার্থীরা এখন তাঁদের বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইছেন এবং এর পেছনে কোনো অনৈতিক বা অন্যায্য প্রক্রিয়া কাজ করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের এই ন্যায্য দাবি পূরণ না হলে, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এই ১৫ জন প্রার্থীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং তাঁদের পরিবারের দুর্দশা একটি দ্রুত ও নিরপেক্ষ সমাধানের দাবি রাখে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here