বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন: ফেড সুদের হার কমানোর প্রত্যাশায় চাঙ্গা বাজার
বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ল। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার কমানোর জোরালো প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে গত সোমবার (২৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে এক শতাংশের বেশি উল্লম্ফন দেখা গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে স্বর্ণের নিরাপদ আশ্রয়ের বৈশিষ্ট্যকে আরও একবার তুলে ধরেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক বিশদ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে (ইডিটি) স্পট স্বর্ণের দাম এক দশমিক দুই শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স চার হাজার ১১১ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছেছে। এটি বাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে, ডিসেম্বর মাসের জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার শূন্য দশমিক চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্সে চার হাজার ৯৪ দশমিক ২ ডলারে স্থির হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বাজারের গতিপথ সম্পর্কে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফেডের সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা এবং এর প্রভাব
টিডি সিকিউরিটিজের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান বার্ট মেলেক এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “বাজার দিন দিন এই বিশ্বাসে আরও দৃঢ় হচ্ছে যে, ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ডিসেম্বরে সুদের হার কমানোর পথে হাঁটছে।” সুদের হার কমানো হলে স্বর্ণের মতো অ-উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর বিনিয়োগের সুযোগ ব্যয় হ্রাস পায়, ফলে এটি ডলারের দুর্বলতা এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি হেজ হিসেবে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাধারণত, সুদের হার কমলে ডলার দুর্বল হয়, যা অন্য মুদ্রাধারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা সস্তা করে তোলে এবং এর চাহিদা বাড়ায়।
নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস গত শুক্রবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার “নিকট ভবিষ্যতে” কমানো যেতে পারে, তবে এতে ফেডের মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা বিঘ্নিত হবে না। বরং, এই পদক্ষেপ দেশের কর্মসংস্থান বাজারে সম্ভাব্য পতন রোধে সহায়ক হবে। তার এই মন্তব্য বাজারে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে, যা সরাসরি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
বাজারের ডেটা এবং বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস
সিএমই ফেডওয়াচ টুল সোমবার জানিয়েছে যে, সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা ৭৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুদের হার পরিবর্তনের বিষয়ে উচ্চ আত্মবিশ্বাস নির্দেশ করে। বার্ট মেলেক আরও যোগ করেন, “আমরা গুরুত্বপূর্ণ ডেটার জন্য অপেক্ষা করছি এবং প্রত্যাশা করছি যে, এটি কিছুটা কমতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি খুব বেশি উচ্চ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব কিছু সম্মিলিতভাবে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করছে।” এই বক্তব্য বাজারের বর্তমান মেজাজ এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করে।
স্টোনএক্সের বিশ্লেষক রোনা অকনেল বলেন, ফেডের সুদের হার কমানোর বিতর্ক এবং বিশেষ করে ইউক্রেন সম্পর্কিত ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন স্বর্ণের দাম আরও বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রায়শই বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দেয়, যা এর দামকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের দৃষ্টিতে এটি এখনো চার হাজার থেকে চার হাজার ১০০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।” তার এই বিশ্লেষণ স্বল্পমেয়াদী স্থিতিশীলতার দিকে ইঙ্গিত করে, যদিও দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে, আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে, যা মূল্যবান ধাতুর বাজারে সামগ্রিক ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করছে।
