সমুদ্র পরিবহন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে, পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) সঙ্গে পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের (পিএনএসসি) মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পেশ করেছে। এই প্রস্তাবনা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।
লন্ডনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও প্রস্তাবনা
গত সোমবার, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) ৩৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের নৌপরিবহন বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে পাকিস্তানের সমুদ্র বিষয়ক মন্ত্রী মুহাম্মদ জুনাইদ আনোয়ার চৌধুরী এই প্রস্তাবনা দেন। পাকিস্তানের স্বনামধন্য দৈনিক দ্য ডন তাদের এক প্রতিবেদনে এই সংবাদ নিশ্চিত করেছে।
প্রস্তাবিত অংশীদারত্বের বিস্তারিত রূপরেখা
পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে দেওয়া এই প্রস্তাবনায় একটি সুসংহত অংশীদারত্বের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, যা সমুদ্র পরিবহন খাতের বিভিন্ন দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো:
- যৌথ কনটেইনার ও বাল্ক শিপিং সেবা: পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে সমন্বিতভাবে কনটেইনার এবং বাল্ক শিপিং সেবা প্রদান, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহকে গতিশীল করবে এবং খরচ কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
- কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: সামুদ্রিক শিল্পে কর্মরত পেশাদারদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নাবিকদের উন্নত কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ। এর মাধ্যমে উভয় দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।
- সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারকরণ: আঞ্চলিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল বিনিময়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
- পারস্পরিক বন্দর-কল সুবিধা: উভয় দেশের বন্দরগুলিতে একে অপরের নৌযানগুলির জন্য কলিং সুবিধা প্রদান, যা লজিস্টিকসকে সহজ করবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে।
- উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পৃক্ততা: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা বৃদ্ধি।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বৃহত্তর লক্ষ্য
পাকিস্তানের মন্ত্রী মুহাম্মদ জুনাইদ আনোয়ার চৌধুরী এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে সমুদ্র পরিবহন-সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরির পাকিস্তানের বৃহত্তর লক্ষ্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যেমন আইএমও (International Maritime Organization) এবং আইএলও (International Labour Organization) সহ প্রাসঙ্গিক আঞ্চলিক সামুদ্রিক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে এই সহযোগিতা সম্প্রসারিত হবে।
আনোয়ার চৌধুরী আরও বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহকে জোরদার করার লক্ষ্যে পাকিস্তান সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। তিনি করাচি বন্দর কর্তৃপক্ষের (কেপিটি) ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা, আধুনিকীকরণ উদ্যোগ এবং উন্নত অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা তুলে ধরে আঞ্চলিক বাণিজ্যে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এই অংশীদারত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই নয়, বরং সামগ্রিক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে উভয় পক্ষই আশাবাদী।
