More

    বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রিতে বড় বাধা নিবন্ধন ফি ও অগ্রিম কর

    একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে, যখন সারা বিশ্ব পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত গতিতে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রযুক্তিকে অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং বাজারে ১০টিরও বেশি ব্র্যান্ডের মডেল সহজলভ্য। তবে, এই সম্ভাবনাময় খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।

    মূল বাধা: উচ্চ নিবন্ধন ফি ও অগ্রিম কর

    এই গতিরোধকের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে অতিরিক্ত নিবন্ধন ফি এবং উচ্চ অগ্রিম কর, যা ভোক্তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। বিক্রেতারা বলছেন, যেখানে বিশ্বের অনেক দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক্যাল ভেহিকেলের (ইভি) ব্যবহার বাড়াতে নিবন্ধন ফি ও অগ্রিম কর মওকুফ করেছে, এমনকি নগদ প্রণোদনাও দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এই ধরনের সুবিধা অনুপস্থিত। বৈদ্যুতিক গাড়ি সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি হলেও, তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি, যা এই শিল্পের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।

    নিবন্ধন ফি’র বৈষম্যমূলক চিত্র

    দেশের সড়কে কোনো গাড়ি চলাচল করাতে হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বাধ্যতামূলক অনুমোদন প্রয়োজন। এই অনুমোদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের নিবন্ধন ফি পরিশোধ করতে হয়। প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে এই ফি সাধারণত ইঞ্জিনের ক্ষমতা বা সিসি (কিউবিক সেন্টিমিটার)-এর উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়; এর মোটরের শক্তি কিলোওয়াট এককে হিসাব করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে সহজলভ্য বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর ক্ষমতা ১০১ থেকে ১৬০ কিলোওয়াটের মধ্যে হয়ে থাকে। এই ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য নিবন্ধন ফি বাবদ ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়, যা একজন সাধারণ ক্রেতার জন্য বিশাল অংকের আর্থিক বোঝা হিসেবে বিবেচিত হয়।

    অগ্রিম করের অস্বাভাবিক পার্থক্য

    অগ্রিম করের ক্ষেত্রেও একটি বিস্ময়কর বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়, যা পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করছে। যেখানে ১৫০০ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জ্বালানিচালিত গাড়ির জন্য অগ্রিম কর মাত্র ২৫ হাজার টাকা এবং ২০০০ সিসি গাড়ির জন্য ৫০ হাজার টাকা নির্ধারিত, সেখানে সমতুল্য ইঞ্জিনক্ষমতার (১০০ থেকে ১৭৫ কিলোওয়াট) একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ২ লাখ টাকা। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; যদি কোনো ব্যক্তির একাধিক গাড়ি থাকে, তাহলে তার বৈদ্যুতিক গাড়ির অগ্রিম করের পরিমাণ আরও বেড়ে ৩ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। পরিবেশবান্ধব গাড়ির প্রতি এই ধরনের উচ্চ করের বোঝা নীতিগতভাবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

    আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং স্থানীয় বাজারের চ্যালেঞ্জ

    র‍্যানকন মোটরসের বিভাগীয় পরিচালক ইমরান জামান খান এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ফি মাত্র ৬০০ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪০ টাকার সমতুল্য। থাইল্যান্ডে তো কোনো নিবন্ধন ফি-ই নেই। এমনকি নেপালের মতো দেশেও এই ফি ২ হাজার টাকার সামান্য বেশি।’ তাঁর এই মন্তব্য বাংলাদেশের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। দেশের এই খাতের ব্যবসায়ীরা বারবার উল্লেখ করছেন যে, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে অধিকাংশ দেশই বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ফি, অগ্রিম কর মওকুফ করা এবং নগদ প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে এই গাড়ির বাজারকে চাঙ্গা করছে। এই পরিস্থিতিতে, যদি একটি সুচিন্তিত ও কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন করা যায় এবং অযৌক্তিক কর ও ফি কমানো যায়, তবে দেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত প্রসার লাভ করবে। এটি শুধু দেশের পরিবেশ রক্ষায় সাহায্য করবে না, বরং প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here