জীবন যখন প্রতিকূলতার এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে, তখন দৃঢ় সংকল্প আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই হয়ে ওঠে বিজয়ের একমাত্র চাবিকাঠি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মোকরামপুরের আলীনগর গ্রামের তরিকুল ইসলাম, যিনি সমাজে পরিচিত ফিন্টু নামে, এমনই একজন যোদ্ধা। শৈশবে পোলিও আক্রান্ত হয়ে শরীরের এক অংশের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে না পারার মতো প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি। বরং, এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাই তাকে এক অসামান্য সফলতার পথে পরিচালিত করেছে, যেখানে ক্রাচ তার নিত্যসঙ্গী হলেও, তা কখনও তার অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারেনি।
অদম্য জীবনের জয়যাত্রা: প্রতিবন্ধকতা থেকে অনুপ্রেরণা
শারীরিক অক্ষমতা কোনো বাধা নয়, বরং নিজেকে প্রমাণের এক বড় সুযোগ – এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করেই তরিকুল ইসলাম তার জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। কঠোর পরিশ্রম, তীক্ষ্ণ মেধা আর অদম্য মানসিকতার জোরে তিনি আজ একজন স্বনামধন্য ও সফল উদ্যোক্তা। তার এই সাফল্যের গল্প শুধু তার নিজের গ্রামেই নয়, বরং বৃহত্তর সমাজে অসংখ্য মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি ফিন্টু সুপার অটো রাইস মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার অধীনে ছয়জন দক্ষ মহাব্যবস্থাপক এবং দুই শতাধিক কর্মচারী নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন, যা তার বিশাল কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতাকে প্রমাণ করে। বর্তমানে, তিনি গর্বের সাথে দুটি অত্যাধুনিক অটো রাইস মিলের মালিক।
ফিন্টু রাইস: একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডের উত্থান
সমাজের চোখে একসময় ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে পরিচিত এই দূরদর্শী ব্যবসায়ী নিজের ডাকনাম ‘ফিন্টু’ নামেই তার প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এনায়েতপুর গ্রামে অবস্থিত তার সুবিশাল চালকলের প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা তিন হাজার মণ। এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা তাকে দেশের চালশিল্পে এক বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। তার চালকল থেকে উৎপাদিত চাল, যা ‘ফিন্টু রাইস’ ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত হয়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এই চালের গুণগত মান ও স্বাদের কারণে এর চাহিদা এতটাই তুঙ্গে যে, স্থানীয় অন্যান্য চালের তুলনায় প্রতিবস্তা ২০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়, যা এর অতুলনীয় মান এবং বাজারদরের ওপর তার অসাধারণ প্রভাবের পরিচায়ক।
বিস্তৃত বাজার ও শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থা
‘ফিন্টু রাইস’ ব্র্যান্ডের চালের চাহিদা শুধু নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর বিস্তৃতি অনস্বীকার্য। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও কানাইপুর; মাদারীপুরের টেকেরহাট, বরিশাল, ঝিনাইদহ, কালীগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা – এই সমস্ত এলাকায় তার চালের ব্যাপক বিক্রি হয়। প্রতিদিন শুধুমাত্র কুষ্টিয়া ও কিশোরগঞ্জেই দুটি করে ট্রাক ভর্তি চাল পাঠানো হয়। নারায়ণগঞ্জে প্রতিদিন এক থেকে তিন ট্রাক এবং ঝিনাইদহে সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ ট্রাক চাল সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও, কালীগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা এবং আলমডাঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতেও ফিন্টু রাইস নিয়মিতভাবে পৌঁছে যায়, যা তার শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সম্প্রতি, ৬০ বছর বয়সী এই অদম্য উদ্যোক্তা তরিকুল ইসলামের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তার শৈশবের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে কীভাবে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই অনুপ্রেরণামূলক গল্প উঠে আসে। তার জীবন সত্যিই প্রমাণ করে যে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনও মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না, যদি তার মধ্যে থাকে অদম্য সাহস আর হার না মানার মানসিকতা।
