More

    সেন্টমার্টিন নিয়ে ১২ নির্দেশনা জারি

    বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, যা তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই ভঙ্গুর ও অনন্য প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুরক্ষায় সম্প্রতি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। দ্বীপটির পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে নতুন একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যা পর্যটকদের জন্য ভ্রমণের নিয়মকানুন ঢেলে সাজিয়েছে।

    সেন্টমার্টিন ভ্রমণের নতুন সময়সীমা ও বিধিনিষেধ

    পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের প্রবেশাধিকারের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটি দ্বীপের প্রতিবেশগত স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।

    • ডিসেম্বর ও জানুয়ারি: এই দুটি মাস পর্যটকদের জন্য রাত্রিযাপনসহ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি পর্যটকদের দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সর্বোচ্চ সুযোগ দেবে, তবে অবশ্যই কঠোর নিয়মকানুন মেনে।
    • নভেম্বর: নভেম্বরে পর্যটকরা শুধুমাত্র দিনের বেলায় দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারবেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য এই প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে।
    • ফেব্রুয়ারি: দ্বীপের পরিবেশগত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। এই সময়টিতে দ্বীপের জীববৈচিত্র্যকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হবে।

    পরিবেশবান্ধব পর্যটনে ১২ দফা নির্দেশনা

    পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত এই ১২ দফা নির্দেশনা বুধবার জারি করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “দ্বীপের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও ভঙ্গুর প্রতিবেশ রক্ষায় এই নির্দেশনাগুলো অপরিহার্য। এগুলো কার্যকর করতে আমরা বদ্ধপরিকর।” এই নির্দেশনাগুলো কেবল পর্যটকদের জন্য নয়, বরং পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।

    পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা: নৌযান ও টিকিট প্রক্রিয়া

    সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রবেশাধিকার ও পরিবহন ব্যবস্থায় কড়া নজরদারি আনা হয়েছে।

    নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এখন থেকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিনে কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না। এর মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত নৌযানের প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হবে, যা পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে।

    পর্যটকদের জন্য টিকিট সংগ্রহের পদ্ধতিতেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। এখন থেকে পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে টিকিট নিতে হবে। প্রতিটি টিকিটে একটি ট্রাভেল পাশ ও কিউআর কোড থাকা আবশ্যক। কিউআর কোড ছাড়া কোনো টিকিটই অবৈধ বলে গণ্য হবে। এই ডিজিটাল পদ্ধতি পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

    দৈনিক পর্যটক সীমা ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড

    দ্বীপের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই সীমা অতিক্রম করলে দ্বীপের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

    পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করবে:

    • রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণে ব্যাঘাত ঘটায়।
    • কেয়া বনে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যা অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর আশ্রয়স্থল।
    • সামুদ্রিক জীব বা প্রবাল সংগ্রহ করা যাবে না। জীবন্ত বা মৃত প্রবাল, শামুক, ঝিনুক সংগ্রহ দ্বীপের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
    • সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই যানগুলো সৈকতের জীববৈচিত্র্য ও বালির গঠন নষ্ট করে।

    প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা

    সেন্টমার্টিনকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে:

    • দ্বীপে পলিথিন বহন করা সম্পূর্ণ নিষেধ
    • একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী যেমন – চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক ইত্যাদি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজস্ব পুনঃব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো দ্বীপের জলজ ও স্থলজ পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা করবে।

    এই সামগ্রিক নির্দেশনাগুলো সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনন্য প্রতিবেশগত ঐতিহ্যকে সুরক্ষা দিতে এবং একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল পর্যটন পরিবেশ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই প্রাকৃতিক সম্পদ অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here