বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনে ইমরান মাহমুদুল এক সুপরিচিত নাম। তার সুর, সংগীত ও কণ্ঠের জাদুতে তিনি জয় করেছেন অসংখ্য শ্রোতার মন। সম্প্রতি সংগীত শিল্পের পরিবর্তিত ধারা এবং গান প্রকাশনার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নানা আলোচনা চললেও, ইমরান মাহমুদুল এই বিষয়টিকে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তার মতে, গান কম হচ্ছে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, বরং সংগীত প্রকাশের মাধ্যম ও প্রক্রিয়াতে এসেছে এক মৌলিক পরিবর্তন, যা শিল্পীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
বদলে যাওয়া সংগীতের প্ল্যাটফর্ম এবং ইমরানের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
সংগীত জগতে অনেকেরই ধারণা যে এখন গান প্রকাশের হার কমে গেছে এবং প্রযোজকের সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু ইমরান মাহমুদুল এই মতামতের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন, পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে, গান তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো স্থবিরতা আসেনি। বিশেষত, নাটক ও চলচ্চিত্রের জন্য গান নির্মাণের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক ব্যস্ততা বিদ্যমান। তার মতে, পূর্বে যেখানে স্বাধীন অডিও গান নির্মাণ এবং তার মিউজিক ভিডিও প্রকাশ ছিল প্রধান ধারা, বর্তমানে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে চলচ্চিত্র ও নাটকের জন্য নির্মিত গান। প্রযোজকেরা এখন মূলত সিনেমা বা নাটকের প্রয়োজনীয়তা ও জনরুচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে গানে বিনিয়োগ করছেন।
ইমরান নিজে যেহেতু এই পরিবর্তিত ধারার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন এবং মূলত নাটক ও চলচ্চিত্রের জন্যই গান তৈরি করছেন, তাই তার কাজের ওপর এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি। তিনি এই পরিবর্তনকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন এবং সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তার ভাষায়, “আমার জায়গা থেকে আমি ভালো আছি। আমি পজিটিভলি দেখতে পাচ্ছি।” এই ইতিবাচকতা কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক সংগীত শিল্পের উন্নতি ও নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতি ইঙ্গিত করে।
সিনেমা ও নাটকের গানে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং নতুন চুক্তি
ইমরান মাহমুদুল ব্যাখ্যা করেন, কেন তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তার মতে, একটি গান কেবল অডিও আকারে প্রকাশ করার চেয়ে যদি তা কোনো চলচ্চিত্র বা নাটকে ব্যবহৃত হয়, তবে সেটির গুরুত্ব এবং প্রচারের ব্যাপ্তি অনেক গুণ বেড়ে যায়। এমনকি, অনেক ক্ষেত্রে নাটকের জন্য তৈরি গানও সিনেমার গানের মতোই ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়ে থাকে। এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে তিনি তার নিজের সুর ও সংগীতে নির্মিত একটি গানের কথা উল্লেখ করেন। এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন দেশের দুই কিংবদন্তি শিল্পী হাবিব ওয়াহিদ ও ন্যান্সি। এটি কোনো মিউজিক ভিডিও বা সিনেমার গান না হয়েও, মাত্র চার মাসে আড়াই কোটিরও বেশি ভিউ অর্জন করেছে এবং শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক প্ল্যাটফর্ম ও মানসম্মত কাজ হলে গান এখনো আগের মতোই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।
ইমরান শুধু একটি নির্দিষ্ট মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নন। তিনি সমানতালে সিনেমা, নাটক এবং মিউজিক ভিডিও—এই তিন মাধ্যমেই অত্যন্ত সক্রিয়। তার এই বহুমুখী কর্মতৎপরতা তাকে সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করতে সাহায্য করছে। তার কর্মপরিধির এই প্রসারের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরেও তার স্বীকৃতি। সম্প্রতি, তিনি ভারতের স্বনামধন্য মিউজিক প্রোডিউসিং সংস্থা ‘বিলিভ ইন্ডিয়া’-এর সঙ্গে দুই বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তি তার কাজের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে তার সুর পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই সমস্ত বিষয় মিলিয়েই ইমরান সংগীতের চারপাশটাকে এক ইতিবাচক আলোতে দেখতে পান।
হাবিব ওয়াহিদ ও ন্যান্সি: এক আবেগপূর্ণ জুটির পুনর্মিলন
সম্প্রতি ইমরান মাহমুদুলের সুর ও সংগীতে প্রথমবার এক ফ্রেমে ধরা দিলেন সংগীত জগতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র হাবিব ওয়াহিদ এবং ন্যান্সি। এই বিশেষ জুটিকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল ইমরানের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই জুটির একত্রিত হওয়াটা ছিল একটি বিশেষ নাটকের পরিচালকের ভাবনাপ্রসূত। পরিচালক প্রথমে হাবিব ওয়াহিদকে দিয়ে গানটি করানোর পরিকল্পনা করলেও, পরে মনে করেন যে হাবিব ভাই ও ন্যান্সি আপু একসঙ্গে গাইলে গানটি আরও দুর্দান্ত হবে।
ইমরান উল্লেখ করেন, হাবিব ওয়াহিদ এবং ন্যান্সি জুটি মানেই সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক গভীর আবেগ। দীর্ঘ বিরতির পর এই জুটির নতুন গান শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ব্যক্তিগতভাবে, ইমরান মাহমুদুল হাবিব ওয়াহিদকে তার সংগীত গুরু হিসেবে গণ্য করেন। তাই গুরুর জন্য গান তৈরি করাটা তার কাছে সবসময়ই এক স্বপ্ন পূরণের মতো। এই সহযোগিতা শুধুমাত্র একটি নতুন গান প্রকাশ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা একাধারে নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
