বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বাউল গান, যা আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদের গভীর বার্তা বহন করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাউল জগৎ দুটি ভিন্ন, অথচ সমান গুরুতর বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারার মর্যাদা ও পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি ঘটনা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ ঘিরে, অন্যটি নারী বাউল শিল্পীদের প্রতি যৌন হয়রানির চাঞ্চল্যকর অভিযোগের প্রসঙ্গে। এই দুটি ঘটনাই দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে এবং বাউল সম্প্রদায়ের ভেতরে ও বাইরে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেফতার
গত ৪ অক্টোবর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় এক সঙ্গীতানুষ্ঠানে দেশের সুপরিচিত বাউল শিল্পী আবুল সরকার ইসলাম ও আল্লাহ সম্পর্কে চরম আপত্তিকর ও কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে তার গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আমলে নেয়।
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি পুলিশ) বিশেষ অভিযানে নামে। ফলস্বরূপ, গত বৃহস্পতিবার ভোরে মাদারীপুর থেকে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই ঘটনা বাউল শিল্পীদের বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার সীমানা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নারী বাউল শিল্পীদের নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য: হাসিনা সরকারের অভিযোগ
যখন বাউল শিল্পী আবুল সরকারের বিচার দাবিতে সারা দেশের মানুষ উত্তাল, ঠিক তখনই বাউল জগতের অভ্যন্তরীণ অন্ধকার দিক উন্মোচন করে আরেক বাউল শিল্পী হাসিনা সরকার পুরুষ বাউল শিল্পীদের নিয়ে চমকপ্রদ ও বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেন। একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি জানান, নারী বাউল শিল্পীদের কর্মসূচিতে ডাকার জন্য প্রায়শই অনৈতিক ও আপত্তিকর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, বিছানায় যেতে রাজি না হলে তাদের কোনো অনুষ্ঠানে ডাকা হয় না। এমনকি তিনি নিজেও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন, যা বাউল সমাজের ভেতরের একটি লুকায়িত সংকটকে প্রকাশ্যে এনেছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে তিনি এই গুরুতর অভিযোগের আঙুল তুলেছেন, ভিডিও বার্তায় তাদের নাম উল্লেখ করেননি, যা বিতর্কের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হাসিনা সরকার তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমি যখন বাউলদের কাছে প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতাম, তাদের বলতাম—আমার তো প্রোগ্রাম নেই, আমার দিকে একটু খেয়াল রাইখেন।” জবাবে পুরুষ বাউল শিল্পীরা তাকে আপত্তিকর ইঙ্গিত দিয়ে বলতেন, “যদি খেয়াল রাখতে হয়, তাহলে কথা শুনতে হবে। যখন ডাকি, তখন আসতে হবে।” তিনি যখন জানতে চাইতেন, “আসলে কী হবে?”, তখন তারা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলতেন, “এইটা কি ভেঙে বলতে হবে?”
এমন পরিস্থিতিতে হাসিনা সরকার দৃঢ়তার সাথে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “মাফও চাই, দোয়াও চাই। ওই ধরনের প্রোগ্রাম আমার দরকার নেই। আমার ইজ্জত বিক্রি করে আমার প্রোগ্রাম নিতে হবে না। এটাকে বাউল গান বলে না।” তার এই বক্তব্য বাউল গানের নামে চলা অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ।
তিনি আরও দাবি করেন যে, পুরুষ বাউল শিল্পীরা নারী শিল্পীদের ‘বেডে নিয়ে’ অর্থাৎ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে গান গাওয়ার সুযোগ দেন। এই নারী বাউল শিল্পী আক্ষেপ করে বলেন, “আমি বাউল শিল্পী হয়ে বলছি—এখন বাউল জগতের এরকম পরিস্থিতি হয়ে গেছে।” তিনি তার অবস্থানে অটল থেকে বলেন, যদি সম্মান ও মর্যাদাকে বিসর্জন দিয়ে গান গাইতে হয়, তবে তাকে কেউ অনুষ্ঠানে না ডাকলে, বায়না না দিলে বা খোঁজখবর না নিলেও তার কিছু যায় আসে না। তার এই বক্তব্য বাউল জগতের শুদ্ধতা ও নৈতিকতাকে পুনরুদ্ধার করার এক আবেদনমূলক বার্তা। এই ঘটনাগুলি বাউল সম্প্রদায়ের প্রতি সমাজের বিশ্বাস এবং তাদের সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে, এবং প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এর সংস্কার ও শুদ্ধিকরণের।
