প্লাস্টিক সার্জারি—আধুনিক বিনোদন জগতের এক বহুল চর্চিত অধ্যায়, যা বিশ্বজুড়ে তারকাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। হলিউডের ঝলমলে পর্দা থেকে শুরু করে বলিউডের চোখ ধাঁধানো দুনিয়া পর্যন্ত, সৌন্দর্যের এই কৃত্রিম সংজ্ঞাকে ঘিরে চলে বিরামহীন আলোচনা ও জল্পনা। বহু শিল্পী নিজেদের কসমেটিক সার্জারির অভিজ্ঞতা খোলাখুলি স্বীকার করলেও, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সংবেদনশীল বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যেতে পছন্দ করেন। মার্কিন পপ সেনসেশন কার্ডি বি এবং বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শিল্পা শেঠি ও আনুশকা শর্মা-এর মতো ব্যক্তিত্বরা প্রকাশ্যে তাদের প্লাস্টিক সার্জারির কথা জানিয়েছেন, যা এই প্রবণতারই এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে নীরবতা ভাঙলেন জয়া আহসান
ঢাকার চলচ্চিত্র অঙ্গনেও প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে ফিসফাস বা গুঞ্জন নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এদেশের অভিনেত্রীরা সাধারণত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে জনসমক্ষে মুখ খুলতে কুণ্ঠাবোধ করেন। এটি যেন এক অলিখিত নিয়ম, যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি এই চিরাচরিত নীরবতা ভাঙলেন বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিমান ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। একটি বেসরকারি গণমাধ্যমের বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি সরাসরি এই প্রসঙ্গে কথা বলে দেশের বিনোদন জগতে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত ঘটালেন। তার এই অকপট এবং সাহসী পদক্ষেপ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে জয়ার অকপট মন্তব্য
অনুষ্ঠানে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জয়া আহসান অকপটে তার সম্পর্কে প্রচলিত একটি গুজব নিয়ে কথা বলেন, যা তাকে বিস্মিত ও ব্যথিত করেছে। তিনি জানান, “মানুষ বলে, আমার পুরো শরীর নাকি প্লাস্টিক সার্জারি করা। এটা কিন্তু আমি শুনেছি। আমার নাকি মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্লাস্টিক সার্জারি করা।” এই ধরনের ভিত্তিহীন মন্তব্যের শিকার হয়ে তিনি কতটা বিব্রত, তা তার কথায় স্পষ্ট হয়। গুজব এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে তাকে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ শারীরিক পরিবর্তনের ধারণা মানুষের মনে গেঁথে গেছে, যা শিল্পীর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
অনলাইন মন্তব্য ও পুরুষদের মানসিকতা প্রসঙ্গে
কেবল প্লাস্টিক সার্জারির অভিযোগই নয়, বোটক্স বা অন্যান্য কসমেটিক পদ্ধতির ব্যবহার নিয়েও তাকে উদ্দেশ্য করে নানা কথা বলা হয়। জয়া এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, “বোটক্স, এটা–সেটা ব্যবহার করি—এগুলো বলে মানুষ। মানুষ মনে করে, এগুলো আমি দেখি না। আমি দেখি মাঝেমধ্যে। আমাদের কমেন্ট বক্স দেখলে দেশের পুরুষদের মানসিক অবস্থাটা বোঝা যায়।” তার এই মন্তব্য দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বা সমালোচনামূলক মন্তব্যের এক বাস্তব ও কদর্য চিত্র তুলে ধরে, যা সমাজের একটি বিশেষ অংশের মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি যে এসব মন্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং সেগুলো তাকে ভাবায়, সে বিষয়টিও পরিষ্কার করেন। তবে, জয়া আহসান নিজে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো হ্যাঁ বা না বলেননি। তার বক্তব্য মূলত জনমনে প্রচলিত ধারণা এবং তার প্রতি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল।
ট্রলিং ও ভুলকে গ্রহণ করার দর্শন
এই আলোচনার মাঝেই উঠে আসে ট্রলিংয়ের প্রসঙ্গ, যা আধুনিক তারকার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২’ ছবিতে তার বলা “মারোওও” সংলাপটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক হাস্যরস ও ট্রলের শিকার হয়েছিল। সেই সময় এই সংলাপটি নিয়ে অনলাইনে মিমের বন্যা বয়ে গিয়েছিল, যা তার জন্য একটি নতুন ও বিতর্কিত অভিজ্ঞতা ছিল।
এই ট্রলিং প্রসঙ্গে জয়া আহসান-এর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত পরিপক্ক ও ইতিবাচক। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “এটা খুব দরকার ছিল, ভালো হয়েছে তো, পচানি খাইছি না। সব সময় সবকিছুতে সফল হব? ভুল করেছি, সেটাই ঠিক আছে। আমার জীবনে কোনো কিছু ভুল না। ওই ভুলগুলো নিয়েই আজকের জয়া আমি।” তার এই কথাগুলো স্পষ্ট করে যে তিনি ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে সেগুলোকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা বা সমালোচনার মুখোমুখি হওয়াকেও তিনি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন, যা তাকে আজকের শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এই দর্শন তার আত্মবিশ্বাস ও জীবনের প্রতি তার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক, যা অনেককেই অনুপ্রাণিত করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে জয়া আহসানের কর্মজীবনের সাফল্য
সাম্প্রতিক সময়ে জয়া আহসান তার কর্মজীবনে বেশ সফল একটি সময় পার করছেন। বাংলাদেশ ও ভারতে তার অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র দর্শক ও সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘তাণ্ডব’, ‘উৎসব’, ‘ডিয়ার মা’ এবং ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। এসব চলচ্চিত্র তাকে উভয় বাংলাতেই আরও জনপ্রিয়তা এবং শিল্পী হিসেবে এক ভিন্ন উচ্চতা এনে দিয়েছে। এই ধারাবাহিক সাফল্য তার শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং তাকে ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও মেধাবী অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
