More

    এক ম্যাচে ১৭ জনকে লাল কার্ড!

    ফুটবল মাঠ মানেই যেখানে তীব্র প্রতিযোগিতা, কৌশলগত লড়াই আর কখনো কখনো আবেগের বিস্ফোরণ। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ঘটনা যেন ফুটবলকে ছাপিয়ে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। একটি মাত্র ফুটবল ম্যাচে, খেলোয়াড়, কোচ ও সহযোগী স্টাফ মিলিয়ে মোট ১৭ জনকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছে – যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই অভাবনীয় ঘটনাটি কেবল ফুটবলপ্রেমীদেরই নয়, বরং ক্রীড়া জগতের সকল মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

    ম্যাচের প্রেক্ষাপট ও চরম উত্তেজনা

    ঘটনাটি ঘটেছিল কোপা বলিভিয়ার শেষ আটের এক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল ব্লুমিং এবং রিয়াল ওরুরো। সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করতে রিয়াল ওরুরোর জন্য জয় ছিল অত্যাবশ্যক, কারণ প্রথম লেগে ব্লুমিং ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল। তাই ব্লুমিংয়ের জন্য একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল শেষ চারে পৌঁছানোর জন্য। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে অমীমাংসিত থাকে, যার ফলে ব্লুমিং সেমিফাইনালে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এই ফলাফল একদিকে যেমন ব্লুমিং শিবিরে আনন্দের ঢেউ এনেছিল, তেমনি রিয়াল ওরুরোর খেলোয়াড়দের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ।

    উত্তেজনার স্ফুলিঙ্গ এবং ভয়াবহ মারামারি

    ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর ব্লুমিংয়ের খেলোয়াড়রা যখন জয়ের আনন্দ উদযাপনে মত্ত, ঠিক তখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বলিভিয়ান সংবাদমাধ্যম এল পোতোসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুহূর্তেই মাঠ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওরুরোর তারকা খেলোয়াড় সেবাস্তিয়ান জেবায়োস, যাকে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা থামানোর চেষ্টা করছিল, তিনি তাদের বেষ্টনী ভেঙে ছুটে গিয়ে বেশ কয়েকজনকে ধাক্কা দেন। তার সতীর্থ হুলিও ভিলা-ও একইভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তার ছোড়া ঘুষি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়। দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে শুরু হয় প্রকাশ্য মারামারি ও হাতাহাতি।

    কোচের আহত হওয়া ও পুলিশি হস্তক্ষেপ

    খেলোয়াড়দের এই সংঘর্ষে যোগ দেন দুই দলের কোচিং স্টাফরাও। রিয়াল ওরুরোর কোচ মার্সেলো রোব্লেদো প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বলিভিয়ান জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের এক সদস্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন। পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, সংঘর্ষের এক পর্যায়ে রোব্লেদো ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাকে কাঁধে আঘাত এবং মাথায় ধাক্কা লাগার কারণে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঠে সহিংসতা এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্যকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুমুঠো মারামারি থামাতে পুলিশকে টিয়ার গ্যাসও ব্যবহার করতে হয়। ব্লুমিংয়ের কোচ মাউরিসিও সোরিয়া দ্রুত তার খেলোয়াড়দের শান্ত করে ড্রেসিংরুমে পাঠিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন।

    রেড কার্ডের অবিশ্বাস্য তালিকা এবং সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া

    ম্যাচ পরবর্তী সরকারি প্রতিবেদন যা প্রকাশিত হয়, তা সকলের জন্য এক অবিশ্বাস্য তথ্য নিয়ে আসে। ব্লুমিংয়ের সাতজন খেলোয়াড় এবং রিয়াল ওরুরোর চারজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হয়। এছাড়াও, দুই দলের প্রধান কোচ এবং তাদের সহকারী কোচরাও লাল কার্ড পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে, একটি একক ম্যাচে মোট ১৭ জনকে লাল কার্ড দেখানোর এই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় রচনা করেছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার ফলস্বরূপ, সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ব্লুমিংয়ের কমপক্ষে ছয়জন খেলোয়াড়কে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ঘটনা বলিভিয়ান ফুটবলে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এবং ফুটবল মাঠে শৃঙ্খলা ও খেলার স্পিরিট বজায় রাখার গুরুত্ব আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here