More

    সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্প, কতটা সুনামির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?

    সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর ২৬শে নভেম্বর বুধবার রাতে বঙ্গোপসাগরে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এর পরপরই, অর্থাৎ ২৭শে নভেম্বর ইন্দোনেশিয়াতে ৬.৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যদিও এই ভূমিকম্পগুলো থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সুনামির খবর পাওয়া যায়নি, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ইন্দোনেশিয়া বা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামি আঘাত হানার ঝুঁকি থেকে যায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টি তুলে ধরেছে।

    ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বিশেষ করে সাগরে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামির ভয়াবহতা অতীতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।

    ২০০৪ সালের স্মরণীয় সুনামি: একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত

    সুনামির ভয়াবহতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বরের ঘটনা। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলে আঘাত হানা ৯.১ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিতে ভারত মহাসাগর সংলগ্ন বহু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই প্রলয়ঙ্করী সুনামিতে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, থাইল্যান্ডসহ ১৪টি দেশে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এমনকি আফ্রিকার দেশগুলো পর্যন্ত এই সুনামির ঢেউ পৌঁছে গিয়েছিল। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলেও সেই সুনামির আঘাত লেগেছিল এবং এতে দুজন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভৌগোলিকভাবে দূরে হলেও সাগরের গভীরে ঘটা শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাব আমাদের দেশেও পড়তে পারে।

    ভূমিকম্প ও সুনামির পারস্পরিক সম্পর্ক

    ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা ব্যাখ্যা করেছেন যে, সাগরে সংঘটিত ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ৬.৫-এর উপরে যায়, তবেই সুনামি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি বলেন, “সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা এ ধরনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সাগরে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে এর গতিপথ, উপকূলে আঘাত হানার সম্ভাব্য সময় এবং পানির উচ্চতা সম্পর্কে সতর্কতা জারি করে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ধরনের সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয়। ফারজানা সুলতানার মতে, বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ৪ বা তার চেয়েও কম থাকে। এই ধরনের দুর্বল ভূমিকম্প থেকে সাধারণত বড় ধরনের ক্ষতির কোনো আশঙ্কা থাকে না।

    তবে, অনেক বিশেষজ্ঞ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলেও এর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামির শঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই বিষয়টি দেশের ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

    সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্প কেন হয়?

    আমাদের পৃথিবীর উপরের অংশকে বলা হয় ভূপৃষ্ঠ, যা বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ গলিত পদার্থের উপরে ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং ক্রমাগত নড়াচড়া করে। এই নড়াচড়ার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ঘটনা ঘটে:

    • একে অপরকে ঠেলে দেওয়া: যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে সরে আসে, তখন তাদের মধ্যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। এই চাপের ফলে শিলাস্তর ভাঁজ হতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে, যা ভূমিকম্পের কারণ হয়।
    • পাশ কাটিয়ে যাওয়া: অনেক সময় দুটি প্লেট একে অপরের গা ঘেঁষে পাশ কাটিয়ে যায়। এই ঘর্ষণের ফলেও ভূমিতে তীব্র কম্পন অনুভূত হতে পারে।
    • নিচে ঢুকে যাওয়া (সাবডাকশন): একটি প্লেট যখন আরেকটি প্লেটের নিচে ঢুকে যায়, তখন তাকে সাবডাকশন বলে। সাধারণত একটি মহাদেশীয় প্লেটের নিচে একটি মহাসাগরীয় প্লেট ঢুকে যায়, যা গভীর ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের অন্যতম কারণ। এই প্রক্রিয়াতেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অফ ফায়ার’ গঠিত হয়েছে, যা বিশ্বের বেশিরভাগ ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির জন্য দায়ী।

    সমুদ্রের নিচে যখন এই টেকটোনিক প্লেটগুলোর মধ্যে আকস্মিক নড়াচড়া বা ঘর্ষণ হয়, তখন সাগরের তলদেশ কেঁপে ওঠে। এই কম্পনই হলো ভূমিকম্প। যদি এই ভূমিকম্প যথেষ্ট শক্তিশালী হয় এবং এর ফলে সমুদ্রের তলদেশ আকস্মিকভাবে উল্লম্বভাবে স্থানচ্যুত হয়, তাহলে বিশাল জলরাশি উপরের দিকে ধাক্কা খায়। এই বিশাল জলরাশির উল্লম্ব স্থানচ্যুতির ফলে সাগরে যে প্রচণ্ড শক্তিশালী ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, তাকেই সুনামি বলা হয়। এই ঢেউগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উপকূলের দিকে ধাবিত হয় এবং যখন অগভীর জলে পৌঁছায়, তখন এর উচ্চতা বহু গুণ বেড়ে গিয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের ভূপ্রকৃতি বিবেচনা করে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here