More

    খেলার মাঠে অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবারও শোকস্তব্ধ এক মর্মান্তিক ঘটনায়। সবুজ ক্যাম্পাসের বুকে খেলাচ্ছলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর এক মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনাবসান ঘটেছে, যা ক্যাম্পাসের চিরচেনা প্রাণবন্ত পরিবেশে এনেছে বিষাদের ছায়া। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্তম্ভিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।

    একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর অকাল প্রস্থান

    নিহত শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম, যিনি সবার কাছে সাকিব নামেই পরিচিত ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের একজন উজ্জ্বল মুখ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আরিফুল, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া দ্বীপের সন্তান। তার অকাল প্রয়াণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্ভাবনাময় তারকার পতন ঘটিয়েছে, যা সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

    ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

    গতকাল, সোমবার বিকেলে, আরিফুল তাঁর সহপাঠীদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের একটি উন্মুক্ত মাঠে ফুটবল খেলায় মগ্ন ছিলেন। প্রতিটি পাস আর প্রতিটি শটে যেখানে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ধ্বনিত হচ্ছিল, সেখানেই আকস্মিকভাবে নেমে আসে বিপদের অশনি সংকেত। খেলার মাঝেই তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন এবং একপর্যায়ে মাঠেই বমি করে ফেলেন। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় তার সহপাঠীরা দ্রুত ছুটে এসে তাকে প্রাথমিকভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ভর্তি করান। কিন্তু চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে, রাত সাড়ে ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ তাকে মৃত ঘোষণা করেন, যা তার পরিবার, বন্ধু এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে এনেছে।

    বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে শোকের ছায়া

    আরিফুলের অকাল প্রয়াণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে এখন বিষাদের সুর। এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে হতবাক ও মর্মাহত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার, সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন একটি যৌথ শোকবার্তায় আরিফুলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। এই শোকের আবহ ক্যাম্পাসে এক সংহতি ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।

    অপূর্ণ স্বপ্ন ও পারিবারিক সংগ্রাম

    আরিফুলের সহপাঠী মো. মুবতাসিম ফয়েজ জানান, আরিফুলের জীবন ছিল সংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের এক নিবিড় প্রতিচ্ছবি। নোয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত হাতিয়া দ্বীপ থেকে উঠে আসা আরিফুলের পথচলা ছিল বন্ধুর। তিনি কেবল একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না, বরং নিজের এলাকার স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন স্বপ্নবাজ তরুণ ছিলেন। মুবতাসিম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আরও বলেন, আরিফুলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছুদিন আগে তার অন্তঃসত্ত্বা বোন প্রয়োজনীয় ও উন্নত চিকিৎসার অভাবে মারা যান। এই মর্মান্তিক ঘটনা আরিফুলের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি তাকে হাতিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছিল। প্রায়শই তিনি তার বন্ধুদের সাথে এলাকার শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার দুরবস্থা নিয়ে আলাপ করতেন এবং এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। নিজের অর্জিত জ্ঞান ও যোগ্যতা দিয়ে তিনি তার জন্মভূমিকে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। তার অকাল প্রয়াণ কেবল একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু নয়, বরং হাতিয়ার বুকে গড়ে ওঠা একদল আলোকিত মানুষের স্বপ্নের অপূর্ণতা।

    চিকিৎসকদের অভিমত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা

    বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দুঃখজনক ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত করে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন যে, আরিফুলের মৃত্যু মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (Cerebral Hemorrhage) কারণে হয়েছে। তিনি আরও জানান, আরিফুলের লাশ তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায় পাঠানোর সকল ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এই কঠিন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, যা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here