সম্প্রতি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে তীব্র আলোচনা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা শিবলী কায়সার, যিনি একসময় ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর জন্য সুপরিকল্পিত কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ, যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা কেবল তার ব্যক্তিগত কৃতকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে গ্রুপিং সৃষ্টির অভিযোগ
জানা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তা শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী চক্র তৈরির অভিযোগ উঠেছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরে গ্রুপিং ও বিভেদ সৃষ্টি করা। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি এমন সব দক্ষ ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করার অপতৎপরতা শুরু করেছেন, যারা বিগত সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন কিন্তু বর্তমানে নিজেদের সততা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল অবস্থায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধরনের কার্যকলাপ একদিকে যেমন বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে, যা দেশের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।
রাজনৈতিক পটভূমি ও রাতারাতি আদর্শ পরিবর্তন
শিবলী কায়সারের রাজনৈতিক অতীত বেশ স্পষ্ট। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন প্রভাবশালী নেতা। প্রথমে তিনি ছাত্রলীগের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে সহ-সভাপতির পদে উন্নীত হন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি প্রকাশ্যে নিজের রাজনৈতিক আদর্শের জয়গান করতেন এবং তার পক্ষে জনমত গঠনে সচেষ্ট ছিলেন, যা তার কর্মজীবনেও প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর তার আদর্শে এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভোল পাল্টে রাতারাতি নিজেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। এই আকস্মিক আদর্শিক পরিবর্তন তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। তিনি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি) পদে নিযুক্ত হন, যা তার এই কথিত রূপান্তরের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
ঘুষ কেলেঙ্কারি ও তদন্তের জালে শিবলী
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি হিসেবে যোগদানের পর থেকেই শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের একজন সহযোগীর মাধ্যমে এক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন। এই ঘুষের বিনিময়ে ওই ব্যবসায়ীকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এই গুরুতর অভিযোগটি যখন জনসম্মুখে আসে, তখন তা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরপরই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘুষ গ্রহণসহ আরও বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। এই গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এরই মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, যা তার কর্মজীবনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এজাহার সংশোধনের প্রচেষ্টা: একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ মার্চ রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। পলাশ হাসান নামে এক ব্যক্তি ঘুষ দাবির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করতে গেলে সেই এজাহারে সরাসরি এসপি মোহাম্মদ শিবলী কায়সারের নাম উল্লেখ করা হয়। এই এজাহারে তার নাম আছে – এই খবর জানার পর তৎকালীন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি শিবলী কায়সার দ্রুত থানায় ছুটে যান।
থানায় পৌঁছে তিনি আকস্মিকভাবে কম্পিউটার রুমে প্রবেশ করেন। সেখানে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান এবং মামলার বাদী পলাশ হাসানকে এজাহারের কপি সংশোধন করতে দেখা যায়। এ ঘটনা শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে, যা কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
