More

    গণভোট অধ্যাদেশ জারি করে গেজেট প্রকাশ

    গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি, যা দেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদের সুচিন্তিত অনুমোদনের পর এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের পথ সুগম হলো, যা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    মঙ্গলবার (২৫শে নভেম্বর) দিবাগত রাতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশিত হয়। এর আগে একই দিনে সকালে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অধ্যাদেশটির খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।

    গণভোটের প্রশ্ন ও পদ্ধতি

    প্রকাশিত অধ্যাদেশে গণভোটের প্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর আওতায় নাগরিকদের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে এবং তারা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের মতামত জানাবেন। উত্থাপিত প্রশ্নটি নিম্নরূপ:

    “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”

    এই প্রশ্নটি দেশের ভবিষ্যত সাংবিধানিক গতিপথ নির্ধারণে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সার্বভৌমত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

    প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারসমূহ

    জুলাই জাতীয় সনদে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে এই গণভোট অত্যন্ত জরুরি। প্রধান প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: জাতীয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। এছাড়াও, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে জুলাই সনদে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার আলোকে পুনর্গঠন করার কথা বলা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।

    সংসদের কাঠামোতেও আনা হচ্ছে মৌলিক পরিবর্তন। আগামী জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। বিদ্যমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পাশাপাশি একটি নতুন ‘উচ্চকক্ষ’ গঠিত হবে, যার সদস্য সংখ্যা হবে ১০০। এই উচ্চকক্ষের সদস্যরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ভবিষ্যতে সংবিধানের যেকোনো সংশোধনের জন্য এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে, যা সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনবে।

    অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও প্রতিশ্রুত বাস্তবায়ন

    জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের মধ্যে রয়েছে:

    • সংসদে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি, যা রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং সমাজের সকল স্তরের প্রতিফলন ঘটাবে।
    • বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনের বিধান, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকার সুযোগ তৈরি করবে এবং জবাবদিহিতা বাড়াবে।
    • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য এবং দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় জনআস্থা ফিরিয়ে আনবে।
    • প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্পর্কিত বিধানসমূহের সুনির্দিষ্টকরণ, যা ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে।

    এছাড়াও, তফসিলে বর্ণিত আরও ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সকল প্রস্তাবনার সম্মিলিত উদ্দেশ্য হলো একটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে।

    অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সকল রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। পাশাপাশি, জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত অন্যান্য সকল সংস্কারও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে, যেখানে জনগণের সরাসরি মতামত দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক পথরেখা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে এবং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here