আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে তিনটি উল্লেখযোগ্য ইসলামিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’। এই শক্তিশালী জোট সারাদেশে প্রায় ৩০০টি সংসদীয় আসনে প্রার্থী দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যেই তারা ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চলেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো তাদের সুনির্দিষ্ট ১৩ দফা দাবি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
বিস্তৃত জোট গঠন ও সম্প্রসারণ
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদায় বিশ্বাসী দেশের হাজার হাজার দরবারকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার কাজ চলছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১২ হাজার দরবারকে আলাদা একটি জোটের ব্যানারে এক ছাতার নিচে একত্রিত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত সমমনা অন্যান্য ইসলামিক দল ও সংগঠনগুলোকেও এই বৃহত্তর জোটে অন্তর্ভুক্ত করে এর পরিধি আরও বিস্তৃত করার নিরন্তর প্রক্রিয়া চলছে। এই ব্যাপকভিত্তিক জোটের পক্ষে জনমত গঠনে ইসলামিক বক্তা হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত গিয়াস উদ্দিন আত-তাহেরীসহ দেশের আরও বহু জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা ইতিমধ্যেই প্রচারণায় অংশ নেওয়া শুরু করেছেন, যা তাদের জনভিত্তিকে আরও মজবুত করছে।
ঐক্যের ভিত্তি এবং প্রধান দলসমূহ
যে তিনটি প্রধান দলের রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স বা জোট গঠিত হয়েছে, সেগুলো হলো: বাংলাদেশী ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। এই ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গঠনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। মাজার-দরবারে উপর ধারাবাহিক হামলা-ভাঙচুর, আলেম-ওলামাদের হত্যা এবং সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়সহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যুতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের দাবি-দাওয়া জোরেশোরে তুলে ধরাই এই ঐক্যের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে। এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন নয়, বরং ইসলামী মূল্যবোধ ও আলেম সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সম্মিলিত প্রয়াস।
জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব ও তাঁদের অঙ্গীকার
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের এই তিন চেয়ারম্যান স্বয়ং সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা হলেন: ইসলামী ফ্রন্টের (প্রতীক: মোমবাতি) সম্মানিত চেয়ারম্যান মাওলানা এম. এ. মতিন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের (প্রতীক: চেয়ার) শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান আল্লামা সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (প্রতীক: একতারা) বিচক্ষণ চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ আল হাসানি আল মাইজভান্ডারি। তাঁদের এই নেতৃত্ব জোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মাওলানা এম. এ. মতিন যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “দেশের মানুষের দাবি-দাওয়া পূরণ, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য সংসদের ভেতরে গিয়ে নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি দল, এবং আমরা চাই একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ। তবে বিগত প্রায় ১৬ বছর ধরে যেভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে, তার কোনো নজির নেই। ওই সময়ে আমাদের দল কিছু নির্বাচনে অংশ নিলেও, স্বৈরাচারী আচরণের কারণে অনেক নির্বাচন বয়কটও করতে বাধ্য হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব।” তাঁর এই বক্তব্য জোটের গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার দৃঢ় অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।
