চট্টগ্রাম বন্দর, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার, সাম্প্রতিককালে এক গভীর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে সরকারের উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি এই চুক্তিকে সরকারের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
সাইফুল হক তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টত জানিয়েছেন যে, এই চুক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্ববর্তী আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির মতোই একটি অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকার একই পথে হেঁটে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, এটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় ও পরামর্শ সভায় এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন সাইফুল হক। বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি কর্তৃক আয়োজিত এই সভার মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করে কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি’। সভায় দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন এবং সরকারের এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক তাঁর বক্তব্যে চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, সরকার প্রবল জনবিরোধিতা সত্ত্বেও অত্যন্ত গোপনে এবং তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি সম্পাদন করেছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। তাঁর মতে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন জনগুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করার কোনো গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট বা নৈতিক অধিকার নেই। জাতিকে ন্যূনতম অবহিত না করে বা কোনো ধরনের উন্মুক্ত আলোচনা ছাড়াই দেশের প্রাণকেন্দ্রস্বরূপ এই বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে সরকারের কী এমন দায় বা বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং এটিকে এক রহস্যজনক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এই চুক্তি নিছকই বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের বিশেষজ্ঞ মহল, রাজনৈতিক দল বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই ধরনের একটি স্পর্শকাতর চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই জাতীয় স্বার্থ এবং সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সাইফুল হক দৃঢ়ভাবে বলেন যে, এটি দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি এবং এর ফলস্বরূপ এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করা অত্যাবশ্যক।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দেশের বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, এলডিপির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সেলিম, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সভাপতি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল, ভাসানী জনশক্তি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ড. আবু ইউসুফ সেলিম, গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান, নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হাসান এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক আর ইউ হাবিব। সকল বক্তাই চুক্তির অস্বচ্ছতা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সম্মিলিতভাবে চুক্তি বাতিলের জোর দাবি জানান।
