আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) অংশগ্রহণ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। দলটির চেয়ারম্যান, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কমনওয়েলথ মহাসচিবের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং বিদেশ যাত্রায় আরোপিত অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া না হলে জাতীয় পার্টি কোনোভাবেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না। এই দৃঢ় অবস্থান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনা বৃদ্ধি করেছে।
গত রবিবার, ২৩ নভেম্বর, সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার অভিজাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সফররত কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বচওয়ের সঙ্গে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। জাতীয় পার্টির পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন দলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মাশরুর মওলা। অন্যদিকে, কমনওয়েলথ মহাসচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এই সংলাপে অংশগ্রহণ করে, যা দেশের নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে।
নির্বাচন উপযোগী পরিবেশের অভাব: জাপার চেয়ারম্যানের পর্যবেক্ষণ
বৈঠকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি কমনওয়েলথ মহাসচিবকে অবহিত করেন যে, দেশে এখনো একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। তার মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূল নয়, যেখানে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং কার্যত এটি দুটি ভিন্ন মেরুতে বিভক্ত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সমাজে এক ধরনের ‘মব কালচার’ বা জনরোষের সংস্কৃতি বিরাজ করছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বর্তমানে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই, যা ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি, গত জুলাই-আগস্ট মাসে দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেগুলোর কোনো প্রত্যাহার করা হয়নি। এমনকি, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিদেশ যাত্রায় আরোপিত অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞাও এখনো বহাল রয়েছে, যা তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কার্যক্রমে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করছে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার খর্ব করছে।
এমতাবস্থায়, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে, যদি মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া না হয়, তাহলে জাতীয় পার্টি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো পরিস্থিতিতেই অংশ নেবে না। এটি দলের নীতিগত এবং আপোষহীন সিদ্ধান্ত, যা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
গণমাধ্যমে জাপার অবস্থান: নির্বাচনমুখী হলেও পরিবেশ নেই
বৈঠক পরবর্তী সময়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত মাশরুর মওলা গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, কমনওয়েলথ মহাসচিব জাতীয় পার্টির নির্বাচনী অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। এর জবাবে দলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ স্পষ্ট করেছেন যে, জাতীয় পার্টি জন্মলগ্ন থেকেই একটি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল এবং তারা সবসময়ই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি নির্বাচন উপযোগী নয় বলে অভিহিত করেছেন।
মাশরুর মওলা আরও বলেন, চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আবারও এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, জুলাই ও আগস্ট মাসে দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে জাতীয় পার্টি কোনোভাবেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য ন্যূনতম পরিবেশ না থাকলে কেবল অংশগ্রহণ করার জন্য নির্বাচন করা অর্থহীন, কারণ তা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হবে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা বাড়াবে।
