More

    বিদেশ সফর সরকার বলছে কমাতে, আইসিটি বিভাগ চলছে উল্টোপথে

    বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় সংকোচনে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এমন সময়ে মালয়েশিয়া সফর করেছেন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রেজওয়ান আলী। তার এই বিদেশ সফর ঘিরেই দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, তার বর্তমান দায়িত্বের সঙ্গে এই সফরের কোনো সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এই দলে অন্তর্ভুক্ত হলেন এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থায়নে তার এই অনুমোদন মিলল?

    খোদ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরেই এই বিষয়ে ফিসফাস শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে বিদেশ সফর সীমিত করতে চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে রেজওয়ান আলীর মতো একজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের দলে অন্তর্ভুক্তি কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

    দায়িত্বের সঙ্গে অসংগতি সত্ত্বেও অন্তর্ভুক্তি: হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার ব্যাখ্যা

    এই সফর প্রসঙ্গে রেজওয়ান আলী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তার বর্তমান দায়িত্বের সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবে তিনি জানিয়েছেন যে, কর্তৃপক্ষ তাকে এই সফরে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষ্যমতে, পূর্বে তিনি উদ্ভাবন দলের সদস্য ছিলেন এবং এই বিষয়ে প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছেন, যা তার অন্তর্ভুক্তির একটি কারণ হতে পারে। যদিও এই পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সফরের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ‘নলেজ শেয়ারিং ওয়ার্কশপ ফর এনহ্যানচিং দ্য ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে’ একজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

    এই বিতর্কিত ১৫ সদস্যের দল মালয়েশিয়া সফর করেছে হাইটেক পার্কের ‘ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পের’ অর্থায়নে। এই দলে রেজওয়ান আলী ছাড়াও ছিলেন পার্ক কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক, যারা মূলত উদ্ভাবনী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। মূলত ‘নলেজ শেয়ারিং ওয়ার্কশপ ফর এনহ্যানচিং দ্য ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে’ অংশ নিতেই এই দল মালয়েশিয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ১০ নভেম্বর এই আয়োজন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, পরে তা পিছিয়ে ১৩ থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

    সচিবের মন্তব্য এবং চলমান বিতর্ক

    এ বিষয়ে আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, “সরকারি কোনো অর্থ খরচ করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সফরগুলোই হচ্ছে। সফরের বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন কর্মকর্তাদের সফরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।” সচিবের এই মন্তব্য একদিকে যেমন সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি অস্বীকার করছে, অন্যদিকে তেমনি রেজওয়ান আলীর মতো ‘অসংশ্লিষ্ট’ কর্মকর্তাদের সফরের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিচ্ছে। তবে ‘ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পের’ খরচে এই সফর হওয়ার কারণে, এর অর্থায়নের উৎস নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

    বিতর্কিত এই ১৫ সদস্যের দলে রেজওয়ান আলী ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রকল্প পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার, আইসিটি বিভাগের উপসচিব (বাজেট ও নিরীক্ষা শাখা) এস এম শফিক এবং উপসচিব (পরিকল্পনা শাখা) আবদুল্লাহ আল মামুন। এছাড়াও ছিলেন হাইটেক পার্কের পরিচালক (কারিগরি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। এই কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তিও স্বাভাবিকভাবেই নজরে এসেছে, তবে একজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অন্তর্ভুক্তিই মূলত মূল আলোচনার কেন্দ্রে।

    সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি বনাম বাস্তব চিত্র

    বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) অধীনস্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় সরকার যখন সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে বিদেশ সফর সীমিত করার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন এমন একটি ঘটনা সরকারের নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে সরকার জনমনে ব্যয় সংকোচনের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে এমন অসঙ্গতিপূর্ণ বিদেশ সফর জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এই ঘটনা সরকারি অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে, যেখানে প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের যুক্তিযুক্ততা এবং প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here