ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়েরকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট। এই আদেশ তার অনুসারী, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যেখানে আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সোমবার (তারিখ উল্লেখ নেই, কিন্তু মূল খবরে সোমবার বলা আছে) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ প্রদান করে, যা অধ্যাপক কার্জনের কারামুক্তির পথ আপাতত উন্মুক্ত করেছে।
হাইকোর্টের আদেশের বিস্তারিত
বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা এবং বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জনের জামিন আবেদনের ওপর বিস্তারিত শুনানি গ্রহণ শেষে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের এই আদেশ একটি রুল জারির মাধ্যমে এসেছে, যার ফলে ছয় মাসের জন্য তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করা হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপটি মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
অধ্যাপক কার্জনের আইনজীবী শেখ আলী আহমেদ খোকন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, হাইকোর্ট তাকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন এবং এই জামিনের কারণে তার কারামুক্তিতে আপাতত কোনো আইনি বাধা নেই। এই খবরে অধ্যাপক কার্জনের পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
জামিনের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রতিনিধিত্ব
অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন এর আগে নিম্ন আদালতে তার জামিন প্রার্থনা করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। নিম্ন আদালতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি গত সপ্তাহে উচ্চ আদালতে অর্থাৎ হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেন। হাইকোর্টে তার পক্ষে আইনজীবী শেখ আলী আহমেদ খোকন এবং আইনজীবী মো. আনিসুজ্জামান শুনানি করেন। তাদের জোরালো যুক্তিতর্কের ওপর ভিত্তি করেই আদালত এই অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশ দেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী, যিনি জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য পেশ করেন। এই আইনি লড়াই উভয় পক্ষের আইনজীবীদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগ
অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে ঘিরে দায়েরকৃত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটির মূল সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ আগস্ট। ওই দিন সকালে তাকেসহ মোট ১৬ জনকে আটকের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর, দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে, শাহবাগ থানায় এই গুরুতর অভিযোগ দায়ের করা হয়। রাজধানীর শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি রুজু করেন। এই মামলায় অধ্যাপক কার্জন ছাড়াও সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এবং সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম সহ আরও ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, যা দেশের আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
গোলটেবিল আলোচনা এবং ঘটনার সূত্রপাত
মামলাটি দায়ের হওয়ার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণের দাবি রাখে। গত ২৮ আগস্ট সকালে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক হাফিজুর রহমান সহ অন্যান্যরা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি গোলটেবিল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন। ‘মঞ্চ ৭১’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম এই আলোচনার আয়োজন করেছিল, যার মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’। এই আলোচনা সভার প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নাম নির্ধারিত থাকলেও, তিনি সেদিন উপস্থিত ছিলেন না। যদিও সভাটি সকাল ১০টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, তবে অনিবার্য কারণে এটি প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১১টায় শুরু হয়। সভার সূচনাতেই প্রথম বক্তব্য পেশ করেন অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন। ধারণা করা হচ্ছে, এই গোলটেবিল আলোচনার বিষয়বস্তু বা সেখানে প্রদত্ত কোনো বক্তব্যের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়, যা এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়াচ্ছে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন জামিন অধ্যাপক কার্জনের জন্য একটি সাময়িক স্বস্তি হলেও, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে। এই ঘটনা দেশের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
