More

    ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার বাইরে ভোট করে জেতা কি কঠিন হয়ে গেল

    সম্প্রতি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (RPO) আনা সংশোধনী দেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গতিপথ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই নতুন বিধান অনুযায়ী, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে তাদের নিজস্ব প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এই সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এখন রাজনৈতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে আগামী জাতীয় সংসদে কি তবে মাত্র দুই বা তিনটি দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে? একই সাথে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নৌকার অনুপস্থিতিতে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সম্ভাব্য প্রাধান্য বিস্তারের ইঙ্গিতও ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে।

    বদলে যাওয়া নির্বাচনী সমীকরণ: নিজস্ব প্রতীক বাধ্যতামূলক

    এতদিন পর্যন্ত দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে জোটবদ্ধ দলগুলোর মধ্যে একটি প্রচলিত রীতি ছিল যে, ছোট শরিক দলগুলো তাদের বড় মিত্র দলের জনপ্রিয় ও সুপরিচিত প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতো। এই প্রথাগত সুযোগ এখন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংশোধিত আইনানুসারে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অন্য কোনো দলের প্রতীকে অংশ নিতে পারবে না। এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে নির্বাচনী কৌশল এবং জোট গঠনের প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে, যেখানে প্রতিটি দলকে নিজস্ব পরিচয় ও প্রতীক নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হতে হবে।

    বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জোটের চালচিত্র

    বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসন্ন ভোটের মাঠে বেশ কয়েকটি দল সক্রিয়ভাবে তৎপর রয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করলেও, কৌশলগত কারণে ৩৭টি আসন ফাঁকা রেখেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই আসনগুলোতে তাদের জোটের শরিক দলগুলোকে ছাড় দেওয়া হবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী সারা দেশেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে, তবে তারা ইসলামী সাতটি দলকে নিয়ে এক ধরনের জোট গঠনের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের নির্বাচনী তৎপরতাকে আরও সুসংহত করতে পারে। এছাড়া, এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও কোনো বৃহৎ জোটে ভিড়বে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনা চলছে।

    ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জোট ও প্রতীকের রাজনীতি

    ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিয়েছে। এসব নির্বাচনে, জোটের সব শরিক না হলেও, অনেক প্রার্থীই বড় দলের জনপ্রিয় প্রতীক যেমন—নৌকা ও ধানের শীষ ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং জয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মূলত, নিজেদের দলের প্রতীকে জয়লাভ করা কঠিন হতে পারে—এই বিবেচনা থেকেই শরিক দলগুলো জোটের বড় ও প্রভাবশালী দলের সুপরিচিত প্রতীকে ভোট করার কৌশল অবলম্বন করতো। এই নতুন আইন সেই দীর্ঘদিনের প্রথাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে নির্বাচনী ফলাফল ও জোটের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

    প্রতীক পরিচিতি ও নতুন মেরুকরণ

    নির্বাচনী প্রতীক রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচয় ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে। বিএনপির ধানের শীষ এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা দীর্ঘদিনের পুরোনো ও সুপরিচিত প্রতীক, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অনেক আলোচনা-জটিলতার পর তাদের প্রতীক হিসেবে শাপলা কলি পেয়েছে। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নৌকা প্রতীকটি আসন্ন নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকবে। এই অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য দলের নিজস্ব প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বাধ্যবাধকতা ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দৃশ্যমানতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নতুন বিধান আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা দেখতে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জাতি।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here