এককালের অপ্রতিরোধ্য লিভারপুল যেন এখন এক গভীর সংকটের মুখে, প্রিমিয়ার লিগে তাদের বর্তমান অবস্থান অতীতের গৌরবময় দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় না। এই মৌসুমটি শুধু খারাপ নয়, বরং খারাপ থেকে খারাপতর এক ঘূর্ণিপাকে প্রবেশ করেছে, যা ফুটবল বিশ্বের অনেককেই হতবাক করে দিয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই অনিয়মিত পারফরম্যান্সের ধারা অব্যাহত থাকলেও, গত পরশু রাতে নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ০-৩ গোলের লজ্জাজনক পরাজয় যেন লিভারপুলকে একেবারে তলানিতে নিয়ে গেছে। এই হার শুধুমাত্র একটি ম্যাচের ফলাফল নয়, এটি দলের আত্মবিশ্বাস এবং সমর্থকদের ধৈর্যের ওপর এক বড় আঘাত।
১২টি ম্যাচ শেষে মাত্র ১৮ পয়েন্ট নিয়ে লিভারপুল বর্তমানে লিগ টেবিলের ১১তম স্থানে ধুঁকছে। শিরোপার দৌড়ে থাকা আর্সেনাল এক ম্যাচ কম খেলেও তাদের চেয়ে ৮ পয়েন্টে এগিয়ে, যা বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের চিত্র। প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বহু আগেই ফিকে হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে এমন করুণ পরাজয়ের পর দলের পতন ঠেকানোর প্রশ্নটি এখন আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। কোচ আর্নে স্লট কি আদৌ এই বিপর্যয় থেকে দলকে টেনে তুলতে পারবেন, নাকি তার ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেবে, তা নিয়ে চলছে তীব্র জল্পনা। ক্লাবের সমর্থক থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষক – সবার মনেই এখন এক অস্বস্তিকর জিজ্ঞাসা দানা বেঁধেছে।
লিভারপুলের দুর্দশার মূলে কী?
আর্নে স্লট-যুগে নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে এই ম্যাচটিকেই সম্ভবত লিভারপুলের সবচেয়ে করুণ পারফরম্যান্স হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। খেলার মাত্র ১২ মিনিট বাকি থাকতে যখন মরগান গিবস-হোয়াইট ফরেস্টের হয়ে তৃতীয় গোলটি জালে জড়ান, তখন হতাশায় নিমজ্জিত শত শত লিভারপুল সমর্থক মাঠ ছাড়তে শুরু করেন। তাদের এই প্রতিক্রিয়া মোটেও অযৌক্তিক ছিল না। ম্যানচেস্টার সিটির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে বড় ব্যবধানে হার হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু লিগ টেবিলের প্রায় তলানিতে থাকা একটি দলের কাছে নিজেদের ঘরের মাঠে এমন একতরফা পরাজয় কেবল অপমানজনক নয়, রীতিমতো লজ্জাস্কর। এই হার যেন দলের আত্মবিশ্বাসকে আরও তলানিতে নামিয়ে দিয়েছে এবং প্রশ্ন তুলেছে তাদের মানসিক দৃঢ়তা নিয়েও।
কোচ আর্নে স্লটের সামনে এখন সমস্যার পাহাড় যেন ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। দলের বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, তিনি নিজে যে এগুলো থেকে দলকে উদ্ধার করতে পারবেন, এমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না, এমনকি বাইরে থেকে কোনো ত্রাণকর্তা এসে তাকে সাহায্য করবে, এমন লক্ষণও অনুপস্থিত। লিভারপুলের দুর্বল রক্ষণভাগ প্রতি ম্যাচেই তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে; খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ব্যক্তিগত ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে বারবার। মাঝমাঠের ধারহীনতা প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে এবং নিজেদের আক্রমণ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে খেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের হাতে। আর আক্রমণভাগ? তারা যেন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে, সুযোগ তৈরি হলেও ফিনিশিংয়ের অভাব চোখে পড়ার মতো। সর্বশেষ সাতটি লিগ ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতেই পরাজয় বরণ করেছে দলটি, যা তাদের বর্তমান দুর্দশার ভয়াবহতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।
এই বিপর্যয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের চোট-আঘাতও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। দলের মূল স্তম্ভের অনেক খেলোয়াড়ই ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে থাকায় দলের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বেঞ্চের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একসময় যে লিভারপুলকে অপ্রতিরোধ্য মনে হতো, তাদের এই হতবিহ্বল অবস্থা সমর্থকদের জন্য চরম হতাশার। শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন এখন কেবল কাগজ-কলমের হিসেবেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তা সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এখন লিভারপুলের জন্য প্রিমিয়ার লিগে সম্মানজনক অবস্থানে ফেরা এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
