বাংলাদেশের প্রাণভোমরা খ্যাত তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণ এবং এর প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে এবার সোচ্চার হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা এই নদীর সংকটময় পরিস্থিতি নিরসনে এক জোরালো গণজমায়েত ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছে তারা। মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা চত্বর পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদ ও সংকল্পের মিলনমেলায়, যেখানে ‘তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন’-এর ব্যানারে শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। তাদের এই কর্মসূচি কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি ছিল তিস্তার ভবিষ্যৎ এবং দেশের জলবায়ু নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
তিস্তার ন্যায্য হিস্যা ও ভারতের প্রতি সমালোচনা
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বক্তারা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি আটকে রেখে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা কৃষি ও জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে বাঁধ খুলে দিয়ে কৃত্রিমভাবে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা জনপদ ও ফসলি জমিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই দ্বিমুখী আচরণ এবং পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে না দেওয়ার জন্য ভারতের কঠোর সমালোচনা করেন বক্তারা। তারা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক জনজীবনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে।
মুক্তির পথ: বাঁধ নির্মাণ ও চুক্তি বাতিলের দাবি
এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি তুলে ধরে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল তিস্তা নদীতে অভ্যন্তরীণ বাঁধ নির্মাণ, যা শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব মোকাবিলায় এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে তিস্তা সংক্রান্ত সকল চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও বাতিল করার দাবি জানানো হয়। বক্তারা মনে করেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এমন নতুন চুক্তি সই হওয়া উচিত, যেখানে তিস্তার পানির সমবণ্টন নিশ্চিত হবে এবং বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। তাদের এই দাবিগুলো শুধু তিস্তার পানির বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ও ছাত্রনেতাদের জোরালো বার্তা
গণজমায়েতের পাশাপাশি সন্ধ্যায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ব্যান্ড দল তাদের প্রতিবাদী গানের মাধ্যমে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। সুর ও ছন্দের মাধ্যমে তারা নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানায়, যা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি শেখ নূর উদ্দীন আবীর বলেন, “মনে রাখবেন, এই বাংলাদেশ কিন্তু আর হাসিনার নাই। এই বাংলাদেশ এখন জেন-জির বাংলাদেশ।” তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনারা যদি আমাদের ন্যায্য হিসাব বুঝে না দেন, আপনারা কিন্তু সাবধানে থাকবেন।” আবীরের এই বক্তব্য তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতা এবং তাদের আপোষহীন মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়।
একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মুজাহিদ ফয়সাল তার বক্তব্যে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “যখন তারা (ভারত) দেখেছে, কৃষিতে আঘাত হানতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, ঠিক সেই জায়গা থেকে তারা উত্তরবঙ্গকে পানিশূন্য করার জন্য তিস্তা বাঁধ বিনির্মাণ করে।” ফয়সাল জোর দিয়ে বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে আমরা পানি পাই না, কিন্তু বর্ষা মৌসুমে সেই পানিতেই আমার কৃষির ক্ষতি হয়। সবাই সেই পানিতে ভেসে যায়। এই অবস্থা আর নয়। অতি শিগগিরই বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করতে হবে।” তার এই বক্তব্য তিস্তা ইস্যুকে শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক পানির সংকট হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে।
এই গণজমায়েত ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ তিস্তা নদীর অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর। তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং জোরালো কণ্ঠস্বর তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
