মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুম-খুনের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ১৫ জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে কারা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জেল-প্রিজনভ্যান লেখা একটি অত্যাধুনিক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সবুজ রঙের গাড়িতে করে তাদের এই স্থানান্তর সম্পন্ন হয়, যা দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থার দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ে বিচারিক কার্যক্রমের প্রস্তুতি
বিগত সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক তিনটি মামলায় মোট ৩২ জন আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য বুধবার (২২ অক্টোবর) দিন ধার্য ছিল। এই বহুল আলোচিত বিচারিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ এবং এর আশপাশের সমগ্র এলাকা জুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ভোর ৪টা থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রতিটি গতিবিধি ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজরদারি বজায় রাখেন, যা ওই দিনের পরিবেশকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে আসে এবং সাধারণ মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে।
নির্ধারিত সময়ে, সকাল ৭টায়, বাংলাদেশ জেল-প্রিজনভ্যান লেখা সবুজ রঙের বিশেষ গাড়িটি ট্রাইব্যুনালের প্রধান ফটকে প্রবেশ করে। এই বিশেষায়িত, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাহনটিতে করেই অভিযুক্ত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আনা হয়। প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর পর অত্যন্ত সতর্কতা ও নিয়মানুবর্তিতার সাথে অভিযুক্তদের একে একে ট্রাইব্যুনালের নির্দিষ্ট হাজতখানায় স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর, সকাল সোয়া ৮টার দিকে, তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর এজলাসে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালের সংক্ষিপ্ত নির্দেশ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিচারিক কার্যক্রমে অভিযুক্ত আসামিদের উপস্থিতি অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় আধঘণ্টার মধ্যেই, অর্থাৎ সকাল পৌনে ৯টার দিকে, আদালতের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে, আইনি প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে, উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন। ওকালতনামায় স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ট্রাইব্যুনাল তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন যে, আদালতে উপস্থিত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে কারা হেফাজতে পাঠানো হবে। এই আদেশের ফলস্বরূপ, তাদের পুনরায় সেই বিশেষ প্রিজনভ্যানে করে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
পলাতক আসামিদের জন্য নির্দেশনা এবং অভিযুক্তদের বর্তমান অবস্থা
একইসঙ্গে, ট্রাইব্যুনাল গুমের পৃথক মামলায় পলাতক আরও ১৩ জন আসামির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন। তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং পলাতক আসামিদের উপর আইনানুগ চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কারাগারে পাঠানো ১৫ জন সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে সক্রিয়ভাবে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন, এবং একজন অবসরোত্তর ছুটিতে (LPR) আছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফা… (এখানে তালিকাটি মূল সংবাদে অসম্পূর্ণ ছিল)। দেশের বিচার ব্যবস্থার অধীনে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া দেশের আইন ও শাসনতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
