দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। আগামীকাল, অর্থাৎ মঙ্গলবার, তিনি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। এই সফরটি কেবল দুটি দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি সুযোগ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য এবং গভীর কৌশলগত গুরুত্ব।
সফরের মূল উদ্দেশ্য ও কৌশলগত তাৎপর্য
এই বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য হলো বহু দশক ধরে চলে আসা তেল ও নিরাপত্তা খাতে দুই মিত্র রাষ্ট্রের সহযোগিতা সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। যুগ যুগ ধরে সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী এবং যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার। জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই অংশীদারিত্ব উভয় দেশের জন্যই অপরিহার্য। এর পাশাপাশি, বাণিজ্য, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং সম্ভাবনাময় পারমাণবিক জ্বালানি খাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার রূপরেখা তৈরি করাও এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশনের লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করাই এই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড: একটি বিতর্কিত অধ্যায়
তবে এই সফর ঘিরে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট বিদ্যমান, যা আন্তর্জাতিক মহলে এখনও আলোচনার বিষয়। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সাংবাদিক এবং সৌদি রাজপরিবারের কট্টর সমালোচক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর এটিই যুবরাজ সালমানের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। এই মর্মান্তিক ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং সৌদি আরবের ভাবমূর্তিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যার রেশ এখনো রয়ে গেছে।
স্মরণীয় যে, সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের ভেতরেই খাসোগিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তুমুল সমালোচনার ঝড় তুলেছিল এবং অনেকেই সরাসরি যুবরাজ সালমানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন, দাবি করেছিলেন যে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হাত রয়েছে। পরবর্তীকালে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের তদন্ত শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, যুবরাজ সালমানই খাসোগিকে অপহরণ বা হত্যার অনুমোদন দিয়েছিলেন। যদিও যুবরাজ সালমান নিজে খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন, তবে তিনি সৌদি আরব সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
কৌশলগত সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
খাসোগি হত্যার মতো একটি গুরুতর ঘটনার সাত বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং সর্বোচ্চ তেল উত্তোলনকারী দেশ সৌদি আরব এখন তাদের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন করে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। উভয় দেশই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চাইছে, যা তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সুযোগটি কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে, গত মে মাসে সৌদি আরবে তাঁর সফরের সময় দেওয়া ৬০ হাজার কোটি ডলারের সৌদি বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চান না। এই বিশাল বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে। মে মাসের ওই সফরে, ট্রাম্প সচেতনভাবে সৌদি আরবে মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান সফরেও তিনি একই পথে হাঁটবেন এবং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে মানবাধিকারের উপর প্রাধান্য দেবেন, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও যুবরাজ সালমানের লক্ষ্য
অন্যদিকে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক অস্থিরতার (যেমন ইরান-সংঘাত, ইয়েমেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু) মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। এই সফরটি তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে সৌদি আরবের প্রভাব বাড়াতে একটি প্ল্যাটফর্ম দেবে। ওয়াশিংটনের সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, এই সফরটি কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকবে। অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়কে পেছনে ফেলে, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিরিখে এই সম্পর্ক কোন নতুন দিকে মোড় নেয় এবং উভয় নেতা কিভাবে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করেন, সেটাই এখন বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে।
