More

    ইসরাইলি গণহত্যার বর্ণনা দিল গাজার এতিম শিশুরা

    ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলছে দখলদার ইসরাইলের অবিরাম ও অমানবিক বর্বরতা। এই দীর্ঘকালীন আগ্রাসনে প্রায় ৭০ হাজার নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে। এই হত্যাযজ্ঞে অগণিত পরিবারে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া; অসংখ্য শিশু তাদের বাবা-মাকে চিরতরে হারিয়ে এতিম হয়েছে, আবার বহু বাবা-মা হারিয়েছেন তাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের। গাজার প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে অগণিত মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ এবং স্বজন হারানোর অনির্বচনীয় বেদনা।

    গাজার অনেক শিশু এত অল্প বয়সে এতিম হয়েছে যে, তারা এখনো জীবনের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হারানোর গভীরতা উপলব্ধি করতে শেখেনি। তাদের নিষ্পাপ চোখে শুধু এক অপূরণীয় শূন্যতা, যা আগামী দিনে তাদের মানসিকতায় এক চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে। এই শিশুরা অকালে বড় হয়ে উঠেছে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে, যেখানে শৈশবের হাসি-খেলার পরিবর্তে তারা দেখেছে ধ্বংস আর মৃত্যু।

    আলজাজিরার মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন: গাজার শিশুদের অশ্রুসিক্ত গল্প

    গত সোমবার (২৪ নভেম্বর) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে সংবেদনশীল মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যটি জানতে চাইছেন – তাদের বাবা-মা কেউ বেঁচে আছে কিনা। এই কথোপকথন গাজার ভেতরের এক নির্মম বাস্তবতাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছে।

    এক ক্ষুদ্র ছেলে শিশুকে জিজ্ঞেস করা হলে সে তার নিষ্পাপ কণ্ঠে জানালো, “আমার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন।” তার এই সহজ স্বীকারোক্তি গাজার শিশুদের প্রতিদিনের বাস্তবতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। এরপর সে তার পাশে বসা এক মেয়ে সহপাঠীর দিকে ইশারা করে বলে, “ওর বাবাও নেই।”

    প্রশ্নকারী তখন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “সত্যি? তোমার বাবা মারা গেছেন?” এরপর আরেকটি শিশুর দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “ওর বাবাও মারা গেছে?” পাশে থাকা আরেক শিশু তখন শুধরে দিয়ে বলে, “না, ওর মা মারা গেছেন।” এই ছোট ছোট শিশুরা অবলীলায় তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের নাম উচ্চারণ করে, যা তাদের ভেতরের অসীম কষ্টকে প্রকাশ করে।

    মেয়ে শিশুটি তখন তার বাবার মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে জানায়, “নাবলুসে আমার বাবা মারা গেছেন।” অন্যদিকে, সেই ছেলে শিশুটি জানায়, “আমার বাবা মারা গেছেন মেরাজে।” কিভাবে তার বাবা মারা গেছেন জানতে চাইলে সে তার বাবার আত্মত্যাগের এক করুণ গল্প শোনায়। সে বলে, “আমার বাবা আটার বস্তা আনতে গিয়েছিলেন, যেন আমরা খেতে পারি।” পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার এই হৃদয়বিদারক ঘটনা সত্যিই চোখে জল এনে দেয়।

    যখন প্রশ্ন করা হয়, “এরপর তিনি শহীদ হয়ে ফিরে এসেছেন?” শিশুটি মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেয়, যা তার বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রকাশ করে। প্রশ্নকারী যখন জিজ্ঞেস করেন, “তোমার বাবার জন্য কি দুঃখ লাগে?” তখনও শিশুটির চোখভরা জল নিয়ে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়, যা তার ছোট্ট হৃদয়ের গভীর বেদনা এবং অপূরণীয় শূন্যতা প্রকাশ করে।

    মেয়েটি আরও জানায়, “আমার বাবাকে ইসরাইলি সেনারা তিনটি গুলি করেছে।” এই বর্বরতার শিকার হয়ে তার বাবা প্রাণ হারিয়েছেন। ছেলেটি তখন তার হার্টের দিকে ইশারা করে দেখিয়ে বলে, “আমার বাবাকে এখানে গুলি করেছে।” এই শিশুরা যে নির্মমতা এবং নৃশংসতার সাক্ষী, তা তাদের ছোট ছোট কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের এই সরল স্বীকারোক্তি যুদ্ধাপরাধের এক জঘন্য চিত্র উন্মোচন করে।

    প্রশ্নকারী এরপর ছেলে শিশুটিকে তার পরিবারের নাম জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, “ওদা।” তারা এখন জেইতুন এলাকায় থাকে কিনা জানতে চাইলে শিশুটি ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়। এরপর মেয়ে শিশুটিকে তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করা হলে সে জানায়, তার বাবার নাম ছিল ফাদি। এই নামগুলো কেবল কিছু শব্দ নয়, এগুলি শত সহস্র হারিয়ে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি, যারা গাজার নিষ্ঠুর বাস্তবতার বলি হয়েছে।

    গাজার এই শিশুরা কেবল তাদের বাবা-মাকে হারায়নি, তারা হারিয়েছে তাদের শৈশব, তাদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবন। এই হৃদয়বিদারক গল্পগুলো গাজার বুকে ঘটে যাওয়া অমানবিকতার জীবন্ত সাক্ষী, যা সভ্য সমাজের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন রেখে যায়। এই শিশুরা আজ বিশ্বকে তাদের নীরব কান্না শোনাচ্ছে, যা প্রতিটি মানবিক হৃদয়ে অনুরণন তোলা উচিত এবং এই নৃশংসতা বন্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here