আঞ্চলিক সংযোগে নতুন দিগন্ত: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভুটানের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ট্রানজিট যাত্রা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এখন কেবল দেশের নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ট্রানজিট চুক্তি ও প্রটোকল স্বাক্ষরের প্রায় দুই বছর আট মাস পর, একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ভুটানের উদ্দেশ্যে পণ্যের একটি চালান সড়কপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। এই ঘটনাটি শুধু পণ্য পরিবহনের একটি কার্যক্রম নয়, বরং বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও কার্যকর করার এক সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।
পরীক্ষামূলক চালানের বিস্তারিত ও রুট ম্যাপ
গত বুধবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে, কাস্টমসের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা অত্যন্ত নিপুণভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, পণ্যবাহী কনটেইনার সমেত একটি ভারী লরি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে। এই চালানটি ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক যাত্রা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য হলো নতুন ট্রানজিট রুট এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোর কার্যকারিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। এই গুরুত্বপূর্ণ চালানটি চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে যাত্রা শুরু করে প্রথমে বাংলাদেশের বুড়িমারী স্থলবন্দর অতিক্রম করবে। এরপর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা স্থলবন্দরে প্রবেশ করে, সেখানকার কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিলিগুড়ি হয়ে প্রায় ৬৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। এই পথচলা আঞ্চলিক সংযোগের এক প্রতীক, যা তিনটি দেশের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য প্রবাহের প্রতিশ্রুতি দেয়।
পণ্যের ধরন ও বাংলাদেশের অর্জিত রাজস্ব
এই পরীক্ষামূলক চালানে থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ৬ হাজার ৫৩০ কেজি বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য সামগ্রী রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আধুনিক শ্যাম্পু, বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু চকলেট, সতেজ জুস এবং পুষ্টিকর পাম ফল। এসব পণ্য ভুটানের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চালান খালাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন চার্জ ও মাশুল বাবদ ১ লাখ ১ হাজার ৭১৩ টাকা রাজস্ব আয় করেছে, যা ভবিষ্যতের বৃহৎ বাণিজ্য প্রবাহ থেকে সম্ভাব্য উচ্চতর রাজস্ব আয়ের একটি ইঙ্গিত দেয়। এই আয় ট্রানজিট ব্যবস্থার অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং বাংলাদেশের জন্য এর আর্থিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্তৃপক্ষের আশাবাদ
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘এই ট্রায়াল রানের মূল উদ্দেশ্য হলো ট্রানজিট প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে সম্ভাব্য ত্রুটি বা চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে চিহ্নিত সমস্যাগুলো নিরসন করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন ও দক্ষ হয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, ভুটান নিয়মিতভাবে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে তাদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং বাণিজ্যিক আদান-প্রদানকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।’ সচিবের এই মন্তব্য আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং ট্রানজিট ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী সফলতার প্রতি তাঁর আশাবাদ ব্যক্ত করে। এটি কেবল দুটি দেশের মধ্যে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি উইন-উইন পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন।
ভুটানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চুক্তির পটভূমি
ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থানগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষত তার স্থলবেষ্টিত চরিত্র, তাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই দেশে কোনো সমুদ্র বা নদীবন্দর না থাকায়, তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য তাদের সর্বদা প্রতিবেশী দেশের বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অতীতে, ভুটান মূলত ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করে তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করত, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল ছিল। এই প্রেক্ষাপটে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ভুটানের জন্য একটি বিকল্প, সুবিধাজনক ও কার্যকর ট্রানজিট রুটের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এর ফলস্বরূপ, ২০২৩ সালের ২২ মার্চ, ভুটান এবং বাংলাদেশ একটি যুগান্তকারী ট্রানজিট চুক্তি ও প্রটোকল স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির পরবর্তী ধাপে, গত বছরের এপ্রিলে ভুটানে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকে উভয়পক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হয় যে, নিয়মিত ট্রানজিট কার্যক্রম শুরুর আগে দুটি পরীক্ষামূলক চালান (ট্রায়াল রান) সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে। বর্তমানের এই চালানটি সেই চুক্তির বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ এবং একটি সুদূরপ্রসারী বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূচনা, যা ভুটানের জন্য নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন করবে।
আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
এই ট্রানজিট ব্যবস্থা শুধু ভুটানের জন্য নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন করবে না, বরং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে। এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমানো, সরবরাহ শৃঙ্খলে দক্ষতা আনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করার মাধ্যমে এই উদ্যোগটি বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটান — এই তিন দেশের সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক বোঝাপাড়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। বলা বাহুল্য, এই সফল ট্রায়াল রান ভবিষ্যতের একটি উজ্জ্বল বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।
