More

    ১২ হাজার বছর পর কেন ইথিওপিয়ার হায়লি গুব্বিতে অগ্ন্যুৎপাত হলো, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

    গত রবিবার, ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘকাল ধরে সুপ্ত থাকা একটি আগ্নেয়গিরি আকস্মিকভাবে জ্বলে উঠেছে, যা আঞ্চলিক ভূ-পরিবেশে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট ছাইয়ের সুবিশাল মেঘমালা কেবল লোহিত সাগর অতিক্রম করেই ক্ষান্ত হয়নি, এটি সুদূর ইয়েমেন, ওমান এবং এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অংশেও ছড়িয়ে পড়ে এক বিস্ময়কর ভূ-প্রাকৃতিক ঘটনার জানান দিয়েছে। এমন একটি ঘটনা বিজ্ঞানীদের মধ্যে গভীর আগ্রহ ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি পূর্ব আফ্রিকার ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

    হায়লি গুব্বির দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা ও আকস্মিক জাগরণ

    ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আফার অঞ্চলের রুক্ষ ভূখণ্ডে অবস্থিত হায়লি গুব্বি নামের এই আগ্নেয়গিরিটি প্রায় ১২ হাজার বছর ধরে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হতো। তার এই দীর্ঘকালের নীরবতা ভঙ্গ করে এটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা ধরে সক্রিয় থাকলেও, এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। স্থানীয় আফডেরা গ্রামটি সম্পূর্ণরূপে আগ্নেয় ছাইয়ে ঢেকে যায়, যা সেখানকার জনজীবনে এক অপ্রত্যাশিত বিঘ্ন ঘটিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দীর্ঘকাল সুপ্ত আগ্নেয়গিরির আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাত ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ ঘটনা, যা এই অঞ্চলের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ সম্পর্কে সীমিত গবেষণার বিষয়টিকেই আরও জোরালো করে তুলেছে।

    ভূ-বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: ম্যাগমা ও প্লেট টেকটোনিক্সের ভূমিকা

    নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ আরিয়ানা সোলদাতি, ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ম্যাগমা তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে একটি আগ্নেয়গিরি এক হাজার বা এমনকি দশ হাজার বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পরেও পুনরায় অগ্ন্যুৎপাত ঘটাতে পারে। এটি হায়লি গুব্বির আকস্মিক জাগরণকে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

    হায়লি গুব্বি একটি ‘শিল্ড আগ্নেয়গিরি’, যা পূর্ব আফ্রিকার রিফ্ট জোনে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়। এখানে আফ্রিকান ও আরব টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রতি বছর ০.৪ থেকে ০.৬ ইঞ্চি হারে একে অপরের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা ভূ-পৃষ্ঠের গভীরে ফাটল সৃষ্টি করে, যা ম্যাগমার উপরে উঠে আসার পথ তৈরি করে এবং আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি ও অগ্ন্যুৎপাতের কারণ হয়। এই ভূ-গাঠনিক কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে, হায়লি গুব্বির অগ্ন্যুৎপাত আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

    ১২ হাজার বছরের রহস্য: স্যাটেলাইট চিত্রের নতুন তথ্য

    ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞানী জুলিয়েট বিগস, হায়লি গুব্বির ১২ হাজার বছরের নিষ্ক্রিয়তার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন, ‘যদি সত্যিই ১২ হাজার বছরেরও আগে শেষ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে, তবে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হব।’ তাঁর মতে, যদিও এই দীর্ঘ সময়ে কোনো অগ্ন্যুৎপাত ঘটেনি বলে প্রচলিত ধারণা ছিল, তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রাবলী ইঙ্গিত দেয় যে আগ্নেয়গিরিটি হয়তো অতীতেও লাভা উদ্‌গিরণ করে থাকতে পারে, যা পূর্ববর্তী ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।

    বিগস আরও উল্লেখ করেন যে, এই অঞ্চলে এত বড় অগ্ন্যুৎপাতের কলাম, যেমন বিশাল ছাতার মতো মেঘ দেখা সত্যিই বিরল। এই ধরনের ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং আফার অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ সম্পর্কে আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এই আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাত শুধু স্থানীয় পরিবেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকার ভূতাত্ত্বিক রহস্য উন্মোচনে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

    Recent Articles

    Related Stories

    Leave A Reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here